

জনতারডাক ডেক্স: আদালতে করা নালিশি আবেদন মামলা হিসেবে এজাহার ভুক্ত করতে বিচারকের নির্দেশনা থানার ওসিরা মানছেন না। নালিশি পক্ষের মধ্যে আপস হয়েছে কিংবা সাক্ষ্য প্রমাণ পাওয়া যায়নি অজুহাতে তাঁরা মামলা এজাহার ভূক্ত করেন না।
এমনি বেশ কিছু মামলার বিষয় গুরুত্ব সহকারে আমলে নিয়েছেন চট্টগ্রামের মুখ্য বিচারিক হাকিম মুন্সী মো. মশিয়ার রহমান। আদালতের কাছে মনে হয়েছে, সংশ্লিষ্ট থানার ওসিরা (অফিসার ইনচার্জ) আদালতের নির্দেশনা অমান্য করছেন।
এ কারণে মঙ্গলবার চট্টগ্রাম জেলা ও দায়রা জজ আদালতের কনফারেন্স হলে অনুষ্ঠিত পুলিশ-ম্যাজিস্ট্রেসি কনফারেন্স আদালতের নির্দেশনা মেনে চলার জন্য পুলিশকে কড়া নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। অন্যথায় সংশ্লিষ্ট পুলিশ কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে।
আদালত সূত্র জানিয়েছে, সাম্প্রতিক সময়ে চট্টগ্রামের বিচারিক হাকিম আদালত এবং মুখ্য বিচারিক হাকিম আদালত থেকে বেশ কিছু নালিশি আবেদন মামলা হিসেবে গণ্য করে এজাহার নেওয়ার জন্য থানায় পাঠানো হয়। পরবর্তীতে সংশ্লিষ্ট থানার অফিসার ইনচার্জ এসব নালিশি আবেদনকে পুঁজি করে ‘নালিশিপক্ষকে থানায় ডেকে মীমাংসা কিংবা ক্ষেত্র বিশেষে ঘটনার বিষয়ে সাক্ষ্য প্রমাণ না পাওয়ায় মামলা রেকর্ড করা সম্ভব হয়নি’ বলে উল্লেখ করছেন। পুলিশের এমন একাধিক কর্মকাণ্ড নজরে আসার পর ক্ষুব্ধ হয়েছেন মুখ্য বিচারিক হাকিম। এ কারণে আদালতের নির্দেশনা কঠোরভাবে মেনে চলার জন্য তিনি সংশ্লিষ্ট পুলিশকে নির্দেশনা দিয়েছেন। একই সঙ্গে ভবিষ্যতে এ ধরনের কর্মকাণ্ড পরিলক্ষিত হলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে জানান।
মুখ্য বিচারিক হাকিম মুন্সী মশিয়ার রহমানের সভাপতিত্বে ওই সভায় জেলা পুলিশ সুপার এ কে এম হাফিজ আক্তার, সিভিল সার্জন ডা. আজিজুর রহমান সিদ্দিকী, অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট, র্যাব-৭ এর পরিচালক, রেলওয়ে পুলিশের প্রতিনিধি, অতিরিক্ত চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট, সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেটগণ উপস্থিত ছিলেন। সভায় মামলা তদন্ত পর্যায়সহ সার্বিক বিষয়ে পুলিশের নানা অবহেলার চিত্র ওঠে আসে।
মুন্সি মো. মশিয়ার রহমান বলেন, ‘চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে বিচারাধীন পুরাতন মামলাগুলো দ্রুত নিষ্পত্তির লক্ষ্যে আইন নির্ধারিত সময়ের মধ্যে তদন্ত শেষ করে ত্রুটিমুক্ত প্রতিবেদন দাখিল করতে হবে। এছাড়া যথাসময়ে মামলার সাক্ষী উপস্থাপন, গ্রেপ্তারকৃত অভিযুক্ত ব্যক্তিকে আইন নির্ধারিত সময়ে আদালতে উপস্থাপন নিশ্চিত করতে হবে।’
বিদ্যমান সমস্যা ও সমাধানের কিছু বিষয় উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘কিছু কিছু ক্ষেত্রে আদালতে দাখিলি নালিশি দরখাস্তের পরিপ্রেক্ষিতে সংশ্লিষ্ট থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তাকে মামলা নেওয়ার নির্দেশনা দেওয়া সত্ত্বেও পুলিশ মামলা নিচ্ছে না। এ ধরনের আইন বহির্ভূত কাজ সম্পূর্ণভাবে বন্ধ করতে হবে।’ তিনি আরও বলেন, ‘সিআর আমলী ফাইলে পুলিশ নির্ধারিত সময়ে প্রতিবেদন দাখিল করে না। এমন কি মামলা খারিজের পর পুলিশের প্রতিবেদন জমা হওয়ার মতো ঘটনা ঘটছে। যা সম্পূর্ণ অনাকাঙ্ক্ষিত।’ তিনি আদালতের নির্ধারিত সময়ে সিআর মামলার প্রতিবেদন দাখিলের জন্য থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের নির্দেশনা দেন।
মুখ্য বিচারিক হাকিম অসন্তোষ প্রকাশ করে বলেন, ‘অতীতে অনেকবার নির্দেশনা দেওয়ার পরও তদন্তকারী কর্মকর্তা পুলিশ প্রতিবেদনের সঙ্গে নির্ধারিত ফরমে এজাহারকারীকে নোটিশ প্রদান করে তা আদালতে দাখিল করছে না। এছাড়া কোন আসামি কোন ধারায় অপরাধ করেছে তা আলাদাভাবে উল্লেখ না করে গতানুগতিক পুলিশ প্রতিবেদন দাখিল করছে। আর ৫৪ ধারায় গ্রেপ্তারকৃত ব্যক্তির বিষয়ে সর্বোচ্চ ১৫ দিনের মধ্যে প্রতিবেদন দাখিলের নির্দেশনা দেন। এখনো ৫৪ ধারায় গ্রেপ্তারকৃত ব্যক্তির বিষয়ে প্রতিদেন দাখিল করতে পুলিশ দীর্ঘ সময় নিচ্ছে। এছাড়া বিচারিক সুবিধার স্বার্থে ডাক্তারি সনদ অল্প সময়ে ইস্যুর জন্য সিভিল সার্জনকে তাগাদা দেন।
সভায় বিচারিক হাকিমরা বলেন, মামলার এফআইআর ফরমে উল্লিখিত ঘটনার তারিখ, সময় ও স্থান এবং আসামির নামের সঙ্গে এজাহারে উল্লিখিত ঘটনার তারিখ, সময় ও স্থান এবং আসামির নামের মিল পাওয়া যায় না। গাড়ি দুর্ঘটনা মামলায় গাড়ির মালিকের নাম-ঠিকানা পাওয়া গেলেও অভিযুক্ত চালকের নাম-ঠিকানা পাওয়া যায়নি উল্লেখে পুলিশ প্রতিবেদন দাখিল করছে। কিছু মামলায় আসামির রিমান্ড মঞ্জুর হওয়ার পর আসামিকে রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ না করে পুনরায় রিমান্ড আবেদন দাখিল করা হচ্ছে। অস্ত্র মামলায় রিমান্ডে নেওয়া আসামির দেখানো মতে অস্ত্র উদ্ধারের পর নতুন করে অস্ত্র মামলা রুজু করছে পুলিশ। এতে অহেতুক মামলার আধিক্য বাড়ছে।
প্রসঙ্গত, মুন্সি মো. মশিয়ার রহমান চট্টগ্রামের মুখ্য বিচারিক হাকিম আদালতে যোগ দেওয়ার পর পুরনো মামলা নিষ্পত্তির ক্ষেত্রে বিশেষ উদ্যোগ নেন। এরই ধারাবাহিকতায় দ্রুত সমন জারি, তিন দিনের মধ্যে নকল সরবরাহ, নতুন রেকর্ডরুম স্থাপনসহ নানা উদ্যোগ বাস্তবায়িত হচ্ছে।



