জাতীয়সারাদেশস্পেশাল

“৩৬ শে জুলাই!” কেন? কি? কিভাবে……..?

“৩৬ শে জুলাই!” কেন? কি? কিভাবে........?

৩৬ শে জুলাই!” কেন? কি? কিভাবে……..?

আন্দোলন-সংঘর্ষ-রাজনৈতিক পালাবদলে উত্তাল দেশ। জুলাই পেরিয়ে শুরু হলো আগস্ট মাস। বাংলাদেশের ছাত্র জনতার গনজাগরণকে রুখে দিতে আরও ভয়ংকর রূপ ধারণ করল শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন স্বৈরাচার সরকার। শুরু হলো দেশব্যপী নৃশংস গণহত্যা। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে অঘোষিত ভাবে গণণা শুরু হলো ৩১ জুলাই, ৩২ জুলাই, ৩৩ জুলাই, ৩৪ জুলাই, ৩৫ জুলাই….। এও হয় নাকি? জুলাইকে টেনে লম্বা করে দিতে চাচ্ছে স্বৈরাচার সরকার, যেন জুলাই আর থামবে না। কিন্তু ছাত্র-জনতার রক্তসমুদ্রে পতন হলো স্বৈরাচারের। জুলাই গিয়ে থামল ৩৬ জুলাইয়ে। আবারও স্বৈরাচার মুক্ত হলো ৩০ লক্ষ শহীদের রক্তে অর্জিত স্বাধীন বংলাদেশ। আমরা সেই মুক্ত স্বাধীন দরজা দিয়ে ঘর থেকে নতুন খোলা আকাশের নিচে এসে দাঁড়িয়ে দেখলাম এক নতুন বাংলাদেশ। এই নতুন বাংলাদেশ নতুন করে স্বাধীন হলো, দ্বিতীয়বার স্বাধীনতা পেলাম আমরা।

 

ছাত্র-জনতার আত্মত্যাগ বাংলাদেশের মানুষের মনে ধাক্কা দিয়ে একটি বন্ধ দরোজা খুলে দিলো। আমরা দেখতে পেলাম সেখানে রক্তলাল গোলাপের মতো তাজা শিশু-কিশোর যুবকদের লাশ। তাদের আর্ত-হাহাকার নেই। তারা বুলেটে বুলেটে ঝাঁজরা হয়ে ফুটে উঠেছে গোলাপি নয় লাল গোলাপ হয়ে।

 

আমরা যে বুলেটখেকো জাতি, সেটা কি ভুলে গেছে কেউ? না ভোলেনি। ১৯৭১ সালে আমরা শাসকদের বুলেট খেয়েছি অকাতরে। প্রাণ দিতে কসুর করেনি কোনো কিশোর, যুবক মুক্তিযোদ্ধা। দেশের জন্য প্রাণ বিলিয়ে দিয়ে তারা দেশ স্বাধীন করেছিল। কিন্তু তাদের সেই লাল-সবুজের পতাকাও লুটে নিয়েছিল ধনবাদী গোষ্ঠীর প্রতিনিধিরা। মুক্তিযোদ্ধাদের হাতে যায়নি সেই রক্তলাল স্বাধীনতার পতাকা। পুঁজির ধর্ম আর শাসকদের রাজনৈতিক কালচার একই মোহনায় যখন উপনীত হয় তখন তার রূপান্তর ঘটে ফ্যাসিবাদে। আর লাভের আশায় ফ্যাসিবাদের সঙ্গ দেয় উগ্র জাতীয়তাবাদ। সেই জাতীয়তাবাদ এতটাই নগ্ন হয় যে, প্রকাশ্যে বলে ‘আপনার মৃত্যুর পরও আমি ও আমরা আপনার সাথে থাকব।’

 

৩৬ জুলাইয়ে আবারো অসংখ্য কিশোর-যুবক ছাত্র-জনতা প্রাণ দিয়ে ইতিহাসে নাম লেখাল নতুন করে স্বাধীনতার- ৩৬ জুলাই ২০২৪।

 

তারা কেন ৩১ জুলাইয়ের পর পয়লা আগস্ট লিখল না? কারণ ওই ধারাবাহিকতা পচে যাওয়া ফ্যাসিজমের ঔপনিবেশিক চিহ্ন। উপনিবেশে ব্রিটিশ শোষকরা যেভাবে আমাদের সম্পদ লুটে নিয়ে গেছে, তেমনি ১৯৭১-উত্তর স্বাধীনতাকালেও শাসকগোষ্ঠী

 

গরিবের সম্পদ শুষে নিয়েছে। ধনিক শ্রেণী রাষ্ট্রক্ষমতায়, তারা দুস্থদের জন্য কোনো কাজ করে না। এটি সাধারণের মনে বিস্ময় জাগায়। তারা প্রচলিত ধ্যান ও ধারণার বশবর্তী, তাই চমকে উঠেছে ৩৬ জুলাই লেখা দেখে। যারা প্রচলিতকে মানতে চায় না, তাদের মনেই ওই ৩৬ জুলায়ের সৃষ্টি। ওই সৃজনের ধারাবাহিকতা হচ্ছে একটি উত্তর আধুনিকতার চিন্তার রূপ। তারা দেখেছে হাসিনার দানবীয় হত্যাযজ্ঞ থামেনি ৩১ জুলাইয়ের পর পয়লা আগস্টেও। তাই রক্তপিপাসুর এই যজ্ঞকে ৩২, ৩৩, ৩৪, ৩৫ তারিখে টেনে নিয়ে গিয়ে চূড়ান্ত করেছে ফ্যাসিস্ট হাসিনা সরকারের পতন ও তার পলায়নকে।

 

শিক্ষার্থী-জনতার এই সম্মিলিত আন্দোলন, কোটা সংস্কার আন্দোলন, ধীরে ধীরে গণবিক্ষোভে পরিণত হয়। সরকারের হিং এতা, হত্যা করে দমনের গতি যত বেগবান হয়েছে, ততই রুখে দাঁড়ানোর নৈতিক সাহস ও শক্তি তারা লাভ করেছে যেন কোথা থেকে। কিভাবে তারা এত সাহস অর্জন করল? তারা তো তখনো এই বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের তিতা পাতাগুলোর নিষ্ঠুরতা দেখেনি, পড়েনি তেমনভাবে। তাহলে? তারা কি কেবল ১৬ বছরের রাজনৈতিক সরকারের অগণতান্ত্রিক রাজনীতির হিং এতা দেখেই শিখেছে যে কেমন হয় ফ্যাসিস্ট সরকারের রূপ ও তাদের লুটেরা-দখলি ধারা?

 

যেসব কিশোর-যুবা মেধাবীদের চাকরির জন্য আন্দোলন করছিল, যাতে বাবা-মায়ের জন্য তারা এমন একটি আয়ের, আশার উৎস হতে পারে। সেই তারাই দেখল মুক্তিযোদ্ধার নামে, তাদের পোষ্যদের জন্য কোটার দরজা খুলেছে। সেই সাথে লাখ লাখ ভুয়া মুক্তিযোদ্ধাকে ভাতা দিয়ে লালন-পালন করেছে নিজ দলের লোকেদের। অন্য দিকে, বঞ্চিত করেছে এবং করছে প্রকৃত যোগ্য, মেধাবীদের। তখন তারা আর পেছনে ফেরার কথা ভাবেনি। কারণ মেধাবীরা যদি কোটাধারীদের সাথে পেরে না ওঠে তাহলে কেবল দেশ, প্রশাসনই ধসে পড়বে না, গোটা জাতির মেরুদন্ড ভেঙে পড়বে। সেটি তো আদতে মৃত্যুরই নামান্তর। সেই চিন্তাই তাদের বুলেটের সামনে বুক পেতে দিতে নির্ভীক হয়ে উঠেছে শিক্ষার্থীরা এবং তারা বিজয় অর্জন করেছে। এই রকম একটি রাজনৈতিক সমাজের মধ্যে পুঁজির বিকাশ না ঘটে, ঘটেছে লুটেরা পুঁজির ফোঁড়া। আর সেই লুটেরা পুঁজির ফোঁড়ার ভেতর থেকে ভীষণরকম টাটানোর চিৎকার আমরা শুনতে পাচ্ছি। তার বেদনা এতটাই তীব্র যে তার অভিঘাতে তৃণমূলের মানুষ থেকে শুরু করে নগরজীবনের মানুষের মধ্যে ঘৃণা ও তিতার সাগর জন্মেছে। আজ সেই তিতার প্রকাশ ঘটেছে প্রতিরোধের আন্দোলনে আর ঘৃণার রোষ আমরা দেখেছি শেখ হাসিনার পলায়ন আর শেখ মুজিবের মূর্তি গুঁড়িয়ে দেয়ার চেষ্টা থেকে। জাতির এই নবপ্রজন্ম নতুন জেনারেশনের, যারা জি-জেন, এই প্রজন্ম তিতা আর ঘৃণার উদগীরণ নিয়ে জন্মেছে। তারা প্রচলিত কাঠামোর বিরুদ্ধে অটল আজ। সেই চেতনাই ৩৬ জুলাইয়ের মূল ভিত্তি। আর এই চেতনাই সংস্কার করবে জাতির মৌলিক চেতনাকে… এটিই তাদের রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক শপথ।

লেখক: মোঃ জসিম উদ্দিন , সম্পাদক, জনতারডাক টুয়েন্টিফোর ডটকম

প্রধান সম্পাদক

জনতার ডাক ২৪ ডট কম এর প্রধান সম্পাদক।

Related Articles

Leave a Reply

Back to top button