অপরাধসারাদেশ

লাশ মেলে, পরিচয় মেলে না

তাহের আহমেদ,  স্টাফ করেসপন্ডেন্ট

সম্প্রতি ইনানী থেকে উদ্ধার এক তরুণীর মরদেহ

কক্সবাজার: ‘পর্যটন রাজধানী’ বলে খ্যাত কক্সবাজার জেলায় গত ৪ মাসে ২১ জন অজ্ঞাতপরিচয় নারী, পুরুষ ও শিশুর মৃতদেহ উদ্ধার করেছে পুলিশ। এদের মধ্যে ২ জনের পরিচয় সম্বন্ধে পুলিশ পরে নিশ্চিত হতে পারলেও বাকি ১৯ জনের পরিচয় সম্পর্কে এখনো নিশ্চিত হওয়া সম্ভব হয়নি।

হত্যা করে পাহাড়ে ফেলা দেওয়া লাশ, সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত ও খুনের শিকার হয়ে  নদী কিংবা সাগরে ভেসে আসা লাশ কিংবা হাসপাতালের বারান্দায় পড়ে থাকা ও চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যাওয়া অনেকের পরিচয় পাওয়া যায়নি।

পুলিশসূত্র জানায়, ২০১৮ সালের ১ ফেব্রুয়ারি শরীরের ৬০ শতাংশ পোড়া ক্ষত নিয়ে উখিয়ার কুতুপালংয়ের এমএসএফ হাসপাতালে ভর্তি হয় ১৫ বছর বয়সী এক অজ্ঞাতনামা কিশোরী। দীর্ঘ একমাস চিকিৎসাধীন থাকার পর ২ মার্চ সে মারা যায়। এরপর বেওয়ারিশ লাশ হিসেবে তাকে দাফন করা হয় কক্সবাজার শহরের গোলদিঘীরপাড়ের বড় কবরস্থানে।

উখিয়া থানার ওসি আবুল খায়ের জনতার ডাক কে   বলেন, আগুনে দগ্ধ সেই কিশোরীর পরিচয় এখনো জানা সম্ভব হয়নি।
৭ ফেব্রুয়ারি রামু উপজেলার দক্ষিণ  খুনিয়াপালংয়ের দরিয়ানগরের মেরিন ড্রাইভ সড়কের পাশের পাহাড় থেকে আনুমানিক ২৬ বছর বয়সী অজ্ঞাতনামা এক তরুণের  মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। কিন্তু এরপর কেটে গেছে ৩ মাস ১২ দিন। কিন্তু এখনো সেই তরুণের পরিচয় নিশ্চিত করতে পারেনি পুলিশ।

এ বিষয়ে মামলার তদন্ত কর্মকর্তা রামু থানার এস আই সৈয়দ সানাউল্লাহ জনতার ডাক কে বলেন, ওই তরুণ সড়ক দূর্ঘটনায় নিহত হয়েছে। তার পরিচয় জানতে নানাভাবে চেষ্টা করা হচ্ছে।

১৭ ফেব্রুয়ারি কক্সবাজার শহরের হোটেল শৈবালের পশ্চিমপাশের সাগরের তীর থেকে ৩৫ বছর বয়সী এক যুবকের মরদেহ উদ্ধার করা হয়। এরপর কেটে গেছে ৩ মাস দুই দিন। কিন্তু পুলিশ এখনো নিহতের পরিচয় ও মৃত্যুর কারণ জানতে পারেনি।

এ বিষয়ে কক্সবাজার সদর থানার ওসি (তদন্ত) কামরুল আজম বলেন, সাগরে নোনা জলের প্রভাবে লাশের চেহারা কিছুটা বিকৃত হয়ে গেছে। তাই পরিচয় নিশ্চিত হতে একটু বিলম্ব হচ্ছে।

২২ ফেব্রুযারি চকরিয়ার মেধাকচ্ছপিয়া জাতীয় উদ্যান থেকে এক যুবকের মৃতদেহ উদ্ধার করা হয়। সেদিনই চকরিয়া থানায় একটি হত্যা মামলা দায়ের করে পুলিশ। এর দুদিন পরে পরিচয় না পাওয়ায় বেওয়ারিশ হিসেবে তাকে দাফন করা হয়। এরপর কেটে গেছে ২ মাস ২৭ দিন । কিন্তু এখনো তার পরিচয় মেলেনি।

এ বিষয়ে চকরিয়া থানার ওসি (তদন্ত ) ইয়াসির আরাফাত জনতার ডাক কে বলেন, মামলাটি বর্তমানে পিবিআই তদন্ত করছে। তাই বিস্তারিত জানাতে পারছি না। তবে যতদূর জানি এখনো এর কোনো সুরাহা হয়নি।

১০ এপ্রিল কক্সবাজার শহরের কলাতলী রোড়ের লাইট হাউস এলাকার হোটেল-মোটেল জোনের বিএম রিসোর্ট থেকে ২৫ বছর বয়সী অজ্ঞাতনামা এক তরুণীর গলাকাটা লাশ উদ্ধার করা হয়। কিন্তু সেই মরদেহ উদ্ধারের ১ মাস ৯ দিন পেরিয়ে গেছে। এখনো তার পরিচয় সনাক্ত করতে পারেনি পুলিশ।

পুলিশসূত্র জানায়, ৯ এপ্রিল রাতে রাহুল ও সুমী স্বামী-স্ত্রী পরিচয় দিয়ে বিএম রিসোর্টের ১০৮ নম্বর কক্ষ ভাড়া করেন। এর পরদিন বিকেলে ওই কক্ষ থেকে গলাকাটা ‍মৃতদেহটি উদ্ধার করা হয়। সেই থেকে রাহুল পলাতক। তবে হোটেলে রেজিস্ট্রারে লিপিবদ্ধ ওই নারী ও পুরুষের নাম-ঠিকানা ভুয়া।

এবিষয়ে কক্সবাজার সদর থানার ওসি (তদন্ত ) কামরুল আজম জনতার ডাক কে  বলেন, হোটেলে লিপিবদ্ধ নাম-ঠিকানা সঠিক নয়। তাই নিহতের পরিচয় নিশ্চিত হওয়া ও হত্যাকারীকে গ্রেফতার করা এখনো সম্ভব হয়নি।

তিনি আরো বলেন, নিহতের পরিচয় নিশ্চিত হওয়ার জন্য ওই নারীর ডিএনএ ও ফ্রিঙ্গার প্রিন্ট সংগ্রহ করা হয়েছে। মেয়েটির আঙ্গুলের ছাপ নির্বাচন কমিশনে পাঠানো হয়েছে।

২ মে দিনগত রাতে উখিয়া উপজেলার  ইনানী সমুদ্রসৈকত থেকে অজ্ঞাতপরিচয় তরুণীর মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। এই ঘটনার পের পার হয়েছে ১৭ দিন।  কিন্তু এখনও ওই তরুণীর পরিচয় মেলেনি। মৃত্যুর কারণও জানাতে পারছে না পুলিশ। তাকে বেওয়ারিশ হিসেবে কবর দেওয়া হয়েছে।

ইনানী পুলিশফাঁড়ির ইনচার্জ মো. সেলিম উদ্দিন বলেন, তরুণীর  পরিচয় জানতে আশ-পাশের ব্যবসায়ী, নাইট গার্ডসহ অনেকের সঙ্গে কথা বলেছি। কিন্তু কেউ মেয়েটির পরিচয় জানাতে পারেনি। ওখানে কীভাবে তার মৃতদেহ এলো তাও জানাতে পারছে না কেউ। পরিচয় নিশ্চিত হওয়ার জন্য আমরা ইতোমধ্যে দেশের সব থানায় বেতারবার্তা ও ছবি পাঠিয়েছি। পাশাপাশি পত্রিকাগুলোতেও খবর প্রকাশ হয়েছে।

এদিকে উখিয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আবুল খায়ের বলেন, ‘সুরতাহালের প্রতিবেদনে তরুণীর শরীরে জখমের চিহ্ন পাওয়া যায়নি। তবে ওই তরুণীর মৃত্যুর কারণ জানতে ময়না তদন্ত প্রতিবেদনের জন্য অপেক্ষা করতে হবে। আর পরিচয় নিশ্চিত হতে নানাভাবে চেষ্টা করা হচ্ছে।

২০১৮ সালের ১৪ জানুয়ারি কক্সবাজার সদর হাসপাতাল থেকে আনুমানিক ৪৫ বছর বয়সী একজন অজ্ঞাতপরিচয় পুরুষের মৃতদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। ১৫ ও ২৪ জানুয়ারি ঈদগাহ থেকে অজ্ঞাতপরিচয় দুটি মরদেহ উদ্ধার হয়।  এদের কারো পরিচয় এখনো নিশ্চিত হতে পারেনি পুলিশ।

২২ ফেব্রুয়ারি কক্সবাজার সদর হাসপাতাল থেকে আনুমানিক ৫৮ বছর বয়সী এক বৃদ্ধের মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। তার পরিচয়ও জানা সম্ভব হয়নি এখনো।

২৮ ফেব্রুয়ারি রামু উপজেলার জোয়ারিয়ার নালার ৬ নং ইউপির নুরপাড়ার রাবার বাগানের ভেতর থেকে পঞ্চাশোর্ধ্ব এক অজ্ঞাতপরিচয় নারীর মরদেহ উদ্ধার করা হয়। এরপর কেটে গেছে ২ মাস  ১৯ দিন। কিন্তু মিলেনি নিহতের পরিচয়।
এ বিষয়ে রামু থানার ওসি লিয়াকত সিকদার বাংলানিউজকে বলেন, ওই নারীর পরিচয় নিশ্চিত হতে পুলিশ কাজ করছে। আশেপাশের সকল থানায় তার ছবি পাঠানো হয়েছে। পত্রিকায় বিবৃতি দেওয়া হয়েছে।

১ মার্চ উখিয়া উপজেলার রাজাপালং ইউপি’র কক্সবাজার টেকনাফ সড়ক থেকে আনুমানিক ৪৫ বছর বয়সী এক নারীর মৃতদেহ উদ্ধার করা হয়। ১৫ মার্চ মহেশখালির কুতুবজুমের সোনাদিয়া সাগর থেকে ভাসমান অবস্থায় দুই যুবকের মরদেহ উদ্ধার করা হয়। ১৬ মার্চ চকরিয়ার হারবাং ইউপির ইনানী রিসোর্টের সামনের সড়কে  দুর্ঘটনায় প্রায় ৭০ বছর বয়সী  অজ্ঞাতপরিচয় এক বৃদ্ধ নিহত হন।  ২৬ মার্চ  কক্সবাজার সদর হাসপাতালের পঞ্চমতলার সার্জারি ওয়ার্ড থেকে ৬০ বছর বয়সী অজ্ঞাতপরিচয় এক বৃদ্ধের মরদেহ উদ্ধার করা হয়।  এছাড়া ৩১ মার্চ কক্সবাজার সদর হাসপাতাল থেকে ১০ দিন বয়সী এক শিশুর মরদেহ উদ্ধার হয়।
২২ এপ্রিল কুতুবদিয়া চ্যানেলের মগনামা ঘাটের পূর্বপাশের নদীতে ভাসমান অবস্থায় এক নবজাতকের মরদেহ উদ্ধার হয়। ৬ মে সদর হাসপাতাল থেকে প্রায় ৪৫ বছর বয়সী এক পুরুষের বেওয়ারিশ লাশ উদ্ধার হয়। এই আটজনের পরিচয়ও পায়নি এখনো পুলিশ।

এ বিষয়ে কক্সবাজার জেলা পুলিশের মুখপাত্র ও কক্সবাজারের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার আফরাজুল হক টুটুল জনতার ডাক কে বলেন, নিহতের পরিচয় জানতে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছবি, পত্রিকায় ছবি সহ বিবৃতি, দেশের সকল থানায় ছবি ও বেতার বার্তা পাঠানো হয়। এছাড়া নিহতের ডিএন.এ সংগ্রহ করে রাখা হয়। লাশ পচে গিয়ে না থাকলে আঙ্গুলের ছাপ সংগ্রহ করা হয়।
তিনি আরও বলেন, যদি হোটেল মোটেল ব্যবসায়ীরা একটু সচেতন হন, তাহলে লাশের পরিচয় সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া অনেকটা সহজ হবে। বুকিংয়ের সময় তারা যদি জাতীয় পরিচয়পত্র, ড্রাইভিং লাইসেন্স কিংবা চাকরির পরিচয়পত্রের কপি নেন তবে কাজটা সহজ হয় পাশাপাশি এটি সকলের জন্য মঙ্গলজনক হবে

Related Articles

Leave a Reply

Back to top button