কানাইঘাটের চাঞ্চল্যকর ও আলোচিত ফরিদ উদ্দিন হত্যা মামলার প্রধান ০৩ আসামীকে গ্রেফতার করেছে র্যাব-৯


জনতার ডাক :: গত ৩১ জানুয়ারি ২০২২ইং তারিখ বিকাল অনুমান ১৫.৪৫ ঘটিকায় সিলেট জেলার কানাইঘাট উপজেলার লক্ষীপ্রসাদ পূর্ব ইউনিয়নের বড়খেওড় গ্রামের এফআইভিডিবি স্কুলের সামনে কাঁচা রাস্তা থেকে ফরিদ উদ্দিন নামের এক ব্যক্তির লাশ কানাইঘাট থানা পুলিশ কর্তৃক উদ্ধার করা হয়। উক্ত ঘটনায় নিহত ফরিদ উদ্দিনের বাবা মোঃ রফিকুল হক সিলেটের কানাইঘাট থানায় ০৭ জনের নাম উল্লেখপূর্বক এবং অজ্ঞাতনামা আসামীদের বিরুদ্ধে একটি হত্যা মামলা দায়ের করেন। যার মামলা নং- ০৩, তারিখ- ০২/০২/২০২২ ইং, ধারা- ৩৪১/৩২৬/৩০৭/৩০২/১০৯/৩৪ দন্ডবিধি ১৮৬০; ইতোমধ্যে সংবাদ মাধ্যমে গুরুত্ব সহকারে প্রচারে হত্যাকান্ডটি সারাদেশে ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি করে।
এই হত্যা মামলার মূল রহস্য উদঘাটন ও আসামী গ্রেফতারের লক্ষ্যে র্যাব-৯ গোয়েন্দা নজরদারীর পাশাপাশি ঘটনার ছায়া তদন্ত শুরু করে। এরই ধারাবাহিকতায় র্যাবের গোয়েন্দা তথ্য ও বিভিন্ন সূত্র মারফত জানা যায়, উক্ত হত্যার মূল অভিযুক্ত নাজিম উদ্দিন মৌলভীবাজার জেলার শেরপুরের কোন এক এলাকায় আত্মগোপনে রয়েছে। প্রাপ্ত তথ্যের ভিত্তিতে গত ০৩ ফেব্রুয়ারি২০২২ তারিখ ২১.৩০ ঘটিকা হতে অদ্য ০৪ ফেব্রুয়ারি ২০২২ তারিখ ০৫.০০ ঘটিকা পর্যন্ত র্যাব-৯ এর একটি চৌকস আভিযানিক দল মৌলভীবাজার জেলার শেরপুর থেকে সাড়াশি অভিযান পরিচালনা করে উক্ত চাঞ্চল্যকর হত্যার রহস্য উদঘাটনপূর্বক হত্যাকান্ডের মূল পরিকল্পনাকারী নাজিম উদ্দিন ও তার দেওয়া তথ্যমতে হত্যাকান্ডের সাথে জড়িত কাওছার আহমদ’কে সিলেট নগরীর দক্ষিন সুরমা এলাকা হতে ও মোস্তাক আহমদকে সিলেট নগরীর বন্দর বাজার এলাকা হতে গ্রেফতার করতে সমর্থ হয়।
গ্রেফতারকৃত ব্যক্তিদের জিজ্ঞাসাবাদে হত্যা কান্ডের মূল রহস্যে উদঘাটনের পাশাপাশি ঘটনার প্রকৃত চিত্র জানা সম্ভব হয়। ঘটনার বাদী ও বিবাদীগণ একই এলাকার পাশাপাশি গ্রামের বাসিন্দা এবং পরষ্পরের নিকটাত্বীয়। এলাকায় বিভিন্ন বিষয়ে প্রভাব বিস্তারকে কেন্দ্র করে পূর্ব থেকেই উভয় পক্ষের মধ্যে মামলা-হামলার ঘটনা চলমান ছিল। ভিকটিম ফরিদ ও তার শ্যালক কয়েছ উদ্দিন @ কয়ছুর আহমদ মিলে একটি পক্ষ এবং সদ্য সমাপ্ত স্থানীয় পরিষদে নির্বাচিত মেম্বার নাজিম উদ্দিন ও তার ভাইগণ, হেলাল আহমদ ও তার ভাইগণ মিলে আরেকটি পক্ষ। এই দুটি পক্ষের বিবাদপূর্ন সম্পর্ককে ঘিরে এলাকার মানুষ আতঙ্কিত থাকতো। সর্বশেষ নাজিম গ্রুপের নেতৃত্বদানকারী নাজিম স্থানীয় পরিষদ নির্বাচনে মেম্বার নির্বাচিত হওয়ার পর থেকেই নতুন করে উত্তেজনার সৃষ্টি হয়। নাজিম গ্রুপ ভিকটিম ফরিদকে নানাভাবে হুমকি ধামকি দিতে থাকে। ঘটনার দুইদিন আগে এনিয়ে ভিকটিম ফরিদ তার ফেসবুকে একটি স্ট্যাটাস দেয়। যেখানে মেম্বার নাজিমের ভাই- এনাম ভিকটিম ফরিদকে শায়েস্তা করার ব্যাপারে কমেন্ট করে। ভিকটিম ফরিদের ফেসবুক স্ট্যাটাসে এনামের এই কমেন্ট নিয়ে এলাকায় আলোচনা-সমালোচনা চলতে থাকে এবং দুই দিন পরই ফরিদ নৃশংস হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়।
ঘটনার দিন অর্থাৎ ৩১ জানুয়ারি ২০২১ খ্রীঃ তারিখে ভিকটিম ফরিদ ১৩.০০ ঘটিকার দিকে বাড়ি থেকে বের হয়ে পার্শ্ববর্তী দোনা বাজারে যায় এবং সেখান থেকে প্রয়োজনীয় কাজ শেষে তার আত্মীয় শাহিনকে নিয়ে ১৪.০০ ঘটিকার দিকে মমতাজগঞ্জ বাজারের উদ্দেশ্যে নিজের বাইকে করে রওয়ানা দেন। মমতাজগঞ্জ বাজারে পৌছে দুইজন নিজেদের কাজ সেরে ১৫.০০ ঘটিকার পর বাড়ির উদ্দেশ্যে রওনা করলে পথিমধ্যে এফআইভিডিবি স্কুলের পাশে জঙ্গলপূর্ণ টিলা থেকে বড় ধারালো দেশীয় অস্ত্র হাতে দুইজন মুখোশধারী ভিকটিম ফরিদ এর উপর অতর্কিত হামলা চালানো শেষে ভিকটিমের একটা কাঁটা পা নিয়ে পালিয়ে যায়। ভিকটিম ফরিদের দুই পা এলোপাতাড়িভাবে কুপিয়ে মারাত্মক জখম করায় অতিরিক্ত রক্তক্ষরণে ফরিদ মারা যায়। ভিকটিম ফরিদের সহযাত্রী শাহীন ও হামলার শিকার হয় এবং ঘটনাস্থল থেকে দৌড়ে পালিয়ে প্রাণে বাঁচে। ঘটনার পরপরই সিলেটের পাশাপাশি দেশজুড়ে নৃশংস এই হত্যাকাণ্ডটি আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়।
গ্রেফতারকৃত ব্যক্তিদের জিজ্ঞাসাবাদ এবং সার্বিক তদন্ত থেকে হত্যাকান্ডের সাথে জড়িত ব্যক্তিদের সংশ্লিষ্টতা এবং হত্যাকান্ড বাস্তবায়নে পরিকল্পনার বিষয়টা স্পষ্ট হয়। মূল পরিকল্পনাকারী নিজাম গ্রুপের লিডার নিজাম মেম্বার এবং মোস্তাকের সুচতুর পরিকল্পনা মোতাবেক হত্যাকাণ্ডটি বাস্তবায়িত হয়। তিন গ্রুপে তারা এই পরিকল্পনার বাস্তবায়ন ঘটায়। পরিকল্পনা মতে ঘটনার দিন নিজাম মেম্বার এবং মোস্তাক নিজেদেরকে এই ঘটনার সাথে সংশ্লিষ্টতার বাইরে রাখতে সিলেট শহরে চলে আসেন। মূলত সিলেট শহরে থেকে হত্যাকাণ্ডের সাথে সংশ্লিষ্ট বাকী দুটি টিমের কার্যক্রম সমন্বয় করছিলেন এই দুইজন। ২য় গ্রুপটি ভিকটিম ফরিদের গতিবিধি পর্যবেক্ষণ করার জন্য নিয়োজিত ছিলেন। ৩য় গ্রুপ পূর্ব থেকে নির্ধারিত জায়গা অর্থাৎ এফআইভিডিবি স্কুলের পাশে জঙ্গলপূর্ণ একটি টিলায় অবস্থান করে এবং মূল পরিকল্পনা অর্থাৎ হত্যাকাণ্ডটি পূর্ণ বাস্তবায়ন করে।
হত্যাকাণ্ডের সাথে জড়িত বাকী পলাতক আসামীদের গ্রেফতারে র্যাবের অভিযান চলমান আছে। গ্রেফতারকৃত ব্যক্তিদের সিলেট জেলার কানাইঘাট থানায় হস্তান্তর কার্যক্রম প্রক্রিয়াধীন।



