হবিগঞ্জ জেলা

ক্ষমতার অপব্যবহার ও বেপরোয়া দুর্নীতি: তবুও বহাল হবিগঞ্জ সদর থানার এসআই ইলিয়াস

ক্ষমতার অপব্যবহার ও বেপরোয়া দুর্নীতি: তবুও বহাল হবিগঞ্জ সদর থানার এসআই ইলিয়াস

ক্ষমতার অপব্যবহার ও বেপরোয়া দুর্নীতি: তবুও বহাল হবিগঞ্জ সদর থানার এসআই ইলিয়াস

হবিগঞ্জ প্রতিনিধিঃ হবিগঞ্জ সদর lথানায় কর্মরত সাব-ইন্সপেক্টর (এসআই) ইলিয়াস আহমদের বিরুদ্ধে ক্ষমতার অপব্যবহার, বেপরোয়া ঘুষ বাণিজ্য এবং সাধারণ মানুষকে নানাভাবে হয়রানির গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। কর্মস্থলে যোগদানের পর থেকেই তার এমন কর্মকাণ্ডে অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। তার এই স্বেচ্ছাচারিতার বিরুদ্ধে ইতোমধ্যে সংবাদ সম্মেলন ও গণবিক্ষোভের মতো ঘটনাও ঘটেছে এলাকায়।

​জানা গেছে, সিলেট দক্ষিণ সুরমা মডেল থানা থেকে বদলি হয়ে হবিগঞ্জ সদর থানায় আসার পরও এসআই ইলিয়াসের ঘুষ বাণিজ্য বন্ধ হয়নি। তার লালসার শিকার হয়েছেন দিনমজুর থেকে শুরু করে ব্যবসায়ী ও সাধারণ শিক্ষার্থীরা।

​ভুক্তভোগীদের জবানবন্দি: আতঙ্কের আরেক নাম ‘ইলিয়াস’
​প্রতিবেদকের অনুসন্ধানে এসআই ইলিয়াসের চাঁদাবাজি ও ভয়ভীতি প্রদর্শনের বেশ কিছু সুনির্দিষ্ট ঘটনা সামনে এসেছে:
​ড্রেজার ব্যবসায়ী নাসিরউদ্দিন: হবিগঞ্জ পৌরসভা এলাকার এই বাসিন্দা জানান, “আমার ড্রেজারের পাইপ চুরি হওয়ার পর থানায় অভিযোগ করতে গিয়েছিলাম। কিন্তু এসআই ইলিয়াস উল্টো আমাকেই চুরির মামলায় ফাঁসিয়ে দেওয়ার ভয় দেখিয়ে ৪০ হাজার টাকা হাতিয়ে নেন।”

​দিনমজুর রবিন দাস: গত ৫ মার্চ তার ছেলে গোপাল দাসকে কোনো কারণ ছাড়াই বাড়ি থেকে তুলে নিয়ে যায় পুলিশ। মিথ্যা মামলায় ফাঁসানোর হুমকি দিয়ে ১৮ ঘণ্টা আটকে রাখার পর, ২৫ হাজার টাকা ঘুষের বিনিময়ে ছেলেকে ছাড়িয়ে নেন রবিন দাস।

​রাতুল ও জাকারিয়া (তরুণ): গত ২১ ফেব্রুয়ারি মাদক অভিযানের নামে পৌরসভার একটি গলি থেকে এই দুই তরুণকে তুলে নেওয়া হয়। ২২ ঘণ্টা আটকে রেখে ৩০ হাজার টাকা ঘুষ নেওয়ার পর তাদের মুক্তি দেওয়া হয়।

​কলেজছাত্র সায়েম সিকদার: গত ১২ মে একটি তুচ্ছ ঘটনাকে কেন্দ্র করে সায়েমকে বাড়ি থেকে তুলে আনেন এসআই ইলিয়াস। প্রথমে ৫০ হাজার টাকা দাবি করলেও পরে ৪০ হাজার টাকার বিনিময়ে তাকে ছাড়া হয়।

​নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক অন্য এক ভুক্তভোগী: গত ৩ মে জিআর ১২২/২৬ নং মামলায় গ্রেফতার হওয়ার পর, অন্য আরেকটি মামলায় নাম ঢুকিয়ে দেওয়ার ভয় দেখিয়ে তার কাছ থেকে ৫০ হাজার টাকা নেন এই পুলিশ কর্মকর্তা।
​প্রতিবেদকের কাছে এসআই ইলিয়াস আহমেদের বিরুদ্ধে প্রমাণসহ এরকম অন্তত শতাধিক গুরুতর অভিযোগ রয়েছে।

​দুর্নীতির বহুমুখী নেটওয়ার্ক
​তদন্তে জানা গেছে, কেবল সাধারণ মানুষকে আটক করে অর্থ আদায়ই নয়, এসআই ইলিয়াসের দুর্নীতির পরিধি আরও বিস্তৃত:
​নিয়োগ ও বদলি বাণিজ্য: পুলিশ বিভাগে নিয়োগ ও বদলি সংক্রান্ত বিষয়ে অবৈধ প্রভাব খাটানো।

​মামলা ও রিমান্ড বাণিজ্য: মোটা অঙ্কের টাকার বিনিময়ে মামলায় নাম ঢোকানো বা বাদ দেওয়া এবং রিমান্ডে নিয়ে নির্যাতনের ভয় দেখিয়ে অর্থ আদায়।
​অপরাধীদের সাথে আঁতাত: স্থানীয় অপরাধী চক্রের সাথে গোপন সমঝোতার মাধ্যমে অনৈতিক সুবিধা গ্রহণ।

​সড়ক ও ফুটপাতে চাঁদাবাজি: সড়ক-মহাসড়কে পরিবহন খাত থেকে ছাপানো স্লিপ বা কাগজের মাধ্যমে নিয়মিত চাঁদা তোলা। এছাড়া ফুটপাতের ব্যবসা ও ইনফরমাল সেক্টর থেকে নিয়মিত মাসোহারা আদায়।

​সাইবার আইন ও ব্ল্যাকমেইল: সাধারণ মানুষের ফোন চেক করে হয়রানি, সাইবার আইনের অপব্যবহার এবং স্থানীয় ব্যবসায়ী ও প্রবাসীদের ব্ল্যাকমেইল করা।
​সংস্কার কমিশনের পর্যবেক্ষণ ও জনমনে ক্ষোভ
​পুলিশ সংস্কার কমিশন ইতোমধ্যে পুলিশের দুর্নীতির অন্তত ৯টি ধরন চিহ্নিত করেছে, যার সবকটির সাথেই এসআই ইলিয়াসের কর্মকাণ্ডের মিল রয়েছে। থানায় ওসিকে (ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা) ম্যানেজ করে তিনি একচ্ছত্র রাজত্ব কায়েম করেছেন এবং জাতীয় পরিচয়পত্র জালিয়াতির মতো অপরাধেও জড়িয়ে পড়েছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
​এতসব সুনির্দিষ্ট অভিযোগ এবং জনগণের ক্ষোভের পরও এই বিতর্কিত পুলিশ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে এখন পর্যন্ত কোনো কার্যকর শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। আইন প্রয়োগকারী সংস্থার একজন সদস্যের এমন বেপরোয়া দুর্নীতিতে ক্ষুব্ধ স্থানীয় সচেতন মহল দ্রুত তার অপসারণ ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছেন।
বিষয়গুলো নিয়ে অভিযুক্ত এসআই ইলিয়াস আহমদের মুবাইল ফোনে সাংবাদিক পরিচয় দিয়ে কথা বলতে চাইলে তিনি জরুরি কাজে ব্যস্ত, পরে ফোন দিবেন বলে ফোন কেটে দেন। কিন্তু পরবর্তীতে ফোন দিলেও ফোন রিসিভ হয়নি।

Related Articles

Leave a Reply

Back to top button